উচ্চ রক্তচাপ: নিঃশব্দ ঘাতক

    অনেক সময় নি:সব্দ ঘাতক বলা হয় উচ্চ রক্তচাপকে। কোনও লক্ষণ উপসর্গ থাকেনা। রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার জন্য হৃদযন্ত্রকে কঠোর শ্রম করতে হয়। শরীরের সর্বত্র রক্ত পাম্প করে ছড়িয়ে দিতে কষ্ট বাড়তে থাকে হৃদযন্ত্রের। এদিকে শরীরের ক্ষতি হতেই থাকে অজান্তে। প্রেশার চেকআপ না করলে সব এরকম চলতে থাকলে পরিনতিতে এক সময় হতে পারে হার্ট এ্যাটাক বা স্ট্রোক। তবে সঠিক দেখভাল, ব্যবস্থাপনা করলে একে চিহ্নিত করা যায়। এবং সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দেহের সর্বত্র রক্তকে ছড়িয়ে দিতে হৃদযন্ত্রের যে বল প্রয়োগ করতে হয় প্রকারান্তরে তাই হলো রক্তচাপ।

    রক্তচাপ অর্থাৎ কি পরিমাণ বল প্রয়োগ করে হার্ট পাম্প করছে এটি নির্ধারিত হয় কি পরিমাণ রক্ত হার্ট পাম্প করে এবং ধমনীতে রক্ত প্রবাহ কতটুকু বাঁধা পায় এদুটো বিষয়ের মাধ্যমে। হার্টকে যত সজোরে কাজ করতে হয় তত উচুতে থাকে রক্তচাপ। উচ্চ রক্তচাপের সচরাচর কিছু কারণও আছে। যেমন- বেশি বয়স, স্থূলতা এবং সোডিয়াম সমৃদ্ধ খাবার। ঘনিষ্ট স্বজনদের যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে রক্তচাপের  সম্ভাবনা বেশি থাকে। মানসিক চাপ ও উচ্চ রক্তচাপ ঘটার পেছনে একটি কারণ হতে পারে। যাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি আছে তারা যদি ধূমপান করেন তাহলে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হতে পারে।

    তবে উচ্চ রক্তচাপ একট উপসর্গ হিসেবে রোগীর কাছে উপস্থিত নাও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা, আর তা হলো উচ্চ রক্তচাপের প্রায়শই কোনও লক্ষণ বা উপসর্গ থাকেনা। প্রথম উপসর্গটি তত ভালো নাও হতে পারে। কোনও কোনও লোকের মাধা ধরা থাকতে পারে। আবার মাথা ধরা অন্য কারণেও হতে পারে। কারো কারো দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে, কারো হতে পারে শ্বাসকষ্ট আবার কারো ব্যায়াম করতে গিয়ে কষ্ট-এমন সব উপসর্গ হতে পারে।

    এভাবে উচ্চ রক্তচাপ চিহ্নিত না হয়ে থাকার পরিনতিতে অনেকের ক্ষেত্রে হতে পারে মারাত্মক। বেশ কিছু দিন উচ্চ রক্তচাপ সুপ্ত থেকে গেলে হৃদযন্ত্র হতে পারে নিষ্ক্রিয় (হার্ট ফেইলিওর)। হার্ট এই বেশি চাপ, রক্ত সজোরে পাম্প করার ভার সইতে পারেনা। এক্ষেত্রে এই ভারকে কিছুটা কমাতে পারলে বেশ কাজ হয়।

    অথচ উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না তা জানা বেশ সহজ। আমরা যদি নিয়মিত রক্তের চাপ চেকআপ করি এবং বেশি রক্তচাপ পাই, তাহলে একে নিয়ন্ত্রণে আনা ও রাখা কঠিন কাজ নয়। ডাক্তারের কাছে নিয়মিত গেলেই তা সম্ভব। প্রথমে লাইফস্টাইল পরিবর্তন আনা এবং এতেও কাজ না হলে নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে নানা রকমের কার্যকর ওষুধ।

    ডাক্তাররা হয়ত ডাইইউরেটিকস দিয়ে শুরু করেন, যাকে বলা হয় (ওয়াটার পিল)। রেচক ওষুধ রক্তচাপ কমানের জন্য। প্রয়োজনে আরো ওষুধ যেমন- ওষুধ যা হূদঘাত হার একটু শ্লথ করতে সহায়তা করে। যেমন-বিটা-ব্লকারস বা ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকারস। যা কাজ করে ধমনীর চারপাশে বৃত্তাকার পেশীগুলোর উপর। ডাক্তাররা কখনও কখনও ব্যবহার করেন এনজিওটেনসিন-কনভারটিং এনযাইম ইনহিবিটারস, সংক্ষেপে বলা হয় এসিই ইনহিবিটারস। ফুসফুসে অবস্থিত সক্রিয় যে প্রোটিন ক্ষুদ্র রক্তনালীদের সংকুচিত করে রক্তচাপ বাড়ায় সেই প্রোটিনের উত্পাদন রোধ করে এই ওষুধ রক্তচাপ কমায়।

    অনেকের প্রয়োজন হয় দুটো বা তিনটা ওষুধ। কারো চারটি ওষুধও লাগতে পারে। কারো কারো জীনগত প্রোগ্রাম এমন তালগোল পাকিয়ে যায় যে এদের রক্তচাপ বাগে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে খাদ্যবিধি ও ব্যায়াম যত বেশি মেনে চলা যাবে তার ওষুধ লাগবে তত কম। রোগীর জন্য শ্রেষ্ঠ দাওয়াই হলো রোগ প্রতিরোধ। পারিবারিক চিকিত্সক, প্রয়োজনে কার্ডিওলজিস্টকে দিয়ে নিয়মিত চেকআপ করা চাই। উচ্চ রক্তচাপে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিনা ও দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষা করিয়েও তা জেনে নেওয়া উচিত।

    যারা ডায়াবেটিস রোগী তাদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত জটিলতা যাতে এড়ানো যায়। এসবগুলো রোগ পরস্পর সম্পর্কিত, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের জন্য এটি হলো সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর অন্যতম।