হার্টের রোগে প্রাকৃতিক বাইপাস বা ইসিপি


বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছেন। একদিকে বাড়ছে হৃদরোগীর সংখ্যা, অন্যদিকে কমছে এতে আক্রান্তদের বয়স। পরিসংখ্যানটি রীতিমতো আতঙ্কজনক। করোনারি আর্টারি ডিজিজ এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত ব্যাধি। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে, হৃদরোগ প্রতিরোধ করা যায়, এমনকি প্রতিকারও আছে এর। যে নতুন যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলা হবে এ রচনায় সে বিষয়ে বহির্বিশ্বে এরই মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাকৃতিক বাইপাস বা ইসিপি থেরাপি (এক্সটার্নাল কাউন্টার পালসেশন)

স্রষ্টা আমাদের হৃদযন্ত্রে শত সহস্র ধমনি দিয়ে দিয়েছেন। তিনটি প্রধান ধমনি ১০টি শাখায় সজ্জিত, যেখান থেকে ১০০টি প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর আবার রয়েছে হাজারো প্রশাখা। এগুলোকে বলা হয় ক্যাপিলারিস। অনেকটা জালের মতো এগুলোর ভেতর আন্তঃসম্বন্ধ রয়েছে; আবার প্রতিটিই অপরটির সঙ্গে রক্ত গ্রহণ ও প্রদানের সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত। একটি প্রধান বা অপ্রধান ধমনিতে ব্লক সৃষ্টি হলে ওই শতসহস্র রক্তনালি হৃৎপি-ের পেশিতে রক্ত সঞ্চালনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে। যদি কোনো উপায়ে ওই রক্তনালিগুচ্ছের চ্যানেলটি মুক্ত ও বিস্তৃত রাখা যায় তাহলে হৃদযন্ত্রের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া সংহত থাকে। এটাকেই বলা হয় প্রাকৃতিক বাইপাস বা ইসিপি থেরাপি। এটা চালু রাখার জন্য যে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় তাকে বলা হয় প্যান বাইপাস।

এই প্রাকৃতিক চ্যানেলটি খেলোয়াড় ও অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে সাধারণত উপস্থিত থাকে। যেহেতু তাদের প্রচুর ব্যায়াম করা লাগে ক্যারিয়ারজুড়ইে। তাই তাদের বেলায় ক্যাপিলারিস পরিণত হয় বর্ধিত টিউবে। এই টিউবের কারণেই শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ব্লকেজ দেখা দিলেও তারা বুক ব্যথা বা এনজিনায় ভোগেন না। এমনকি ১০০ ভাগ ব্লকেজ হলেও তাদের হৃৎপিন্ডের মাংশপেশী বিকল হয়ে পড়ে না।

এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে এই প্রাকৃতিক বাইপাস চ্যানেল সৃষ্টি করা যায়। না, আমরা একজন হৃদরোগীকে দৌড়বিদের মতো দৌড়ানোর পরামর্শ দেব না। তাদের আমরা এমন কোনো কঠিন ব্যায়ামও দেব না যাতে বুকের সম্প্রসারণ হয়ে বুক ব্যথা অনুভূত হবে। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যেটা সমান্তরাল রক্ত-চ্যানেল সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে- এই যন্ত্রটির নাম ইসিপি (এক্সটার্নাল কাউন্টার পালসেশন)। মেশিনটি কৃত্রিমভাবে ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। মেশিনের এক ঘণ্টার সহায়তায় এই সমান্তরাল আর্টারি/ক্যাপিলারি সিস্টেম চালু করে দেয় এবং হৃৎপিন্ডের পেশিতে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন শুরু করে। সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক চ্যানেল চালু করার জন্য এই মেশিনের মাধ্যমে ৩৫টির মতো সেশনের প্রয়োজন পড়ে। এভাবে খুব সহজেই বাইপাস সার্জারির বিকল্প হতে পারে এই মেশিন।

ইসিপি থেরাপিতে কারা বেশি উপকার পাবেন -

১. যিনি এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছেন, বিশেষত :

- হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা বেশি কমে গেলে (<৩০%, <২০%)

- বেশি বয়স - মাল্টিপল ব্লকেজ , যিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন

- কিডনির কার্জকরী ক্ষমতা কমে গেলে

- হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হলে

- পায়ের আর্টারি ও কিডনি আর্টারিতে অত্যধিক ব্লকেজ থাকলে

- কেরোটিড আর্টারি ও কিডনি আর্টারিতে ব্লকেজ থাকলে।

২. যাদের হার্টের রক্তনালিতে ব্লক আছে কিন্তু রক্তনালির গঠন বৈশিষ্ট্যের কারণে রিং বসানো বা বাইপাস সার্জারি করা যাচ্ছে না।

৩. রক্তনালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে ক্যালসিয়াম জমে গেছে বিধায় যেখানে রিং বসানো সম্ভব হচ্ছে না।

৪. হার্টের রক্তনালিতে ব্লক আছে কিন্তু কিডনি ফেইলিউর বা এর আগে ঘটে যাওয়া ব্রেন স্ট্রোকের কারণে বাইপাস সার্জারি করা যেখানে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

৫. অপারেশন বা এনজিওপ্লাস্টি করা দরকার কিন্তু রোগী ভয় পাচ্ছে।

৬. এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির পর যার আবার ব্লকেজ ধরা পড়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি -

ইসিপি হার্টের ব্লকেজের চিকিৎসায় পরীক্ষিত চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমেরিকার সর্বোচ্চ চিকিৎসাবিষয়ক মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এফডিএ এক যুগ আগে ১৯৯৮ সালে এই স্বীকৃতি প্রদান করে।

 

ডা. গোবিন্দচন্দ্র দাস

সাবেক অধ্যাপক, অ্যালার্জি বিভাগ

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

দ্যা অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা সেন্টার

হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, গ্রীণরোড়,ঢাকা।

অ্যাম্বুলেন্স হার্বাল ও আয়ুর্বেদিক হোমিওপ্যাথি রুপ চর্চা