আত্নহত্যা: একটি মানসিক রোগ


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী গড়ে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যা করে প্রায় ৮ লাখ মানুষ। আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার সংখ্যা এর কয়েকগুণ। গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের অধিকাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। আত্মহত্যার জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক রোগটি হচ্ছে বিষন্নতা। গুরুতর বিষণœতা বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ১৫ শতাংশই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন- সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি, বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা অত্যধিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ এবং কিছু ব্যক্তিত্ব-বৈকল্য বা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যেও আত্মহত্যা-প্রবণতা সাধারণের চেয়ে বেশি। কিন্তু রোগাক্রান্তদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ চিকিৎসাসেবা নেন না বা পান না। এর অন্যতম কারণ মানসিক রোগ ও আত্মহত্যা সম্পর্কে কুসংস্কার। মানসিক রোগ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই স্বীকার করতে চান না অনেকে। মানসিক রোগের অনেক উপসর্গকে জিন-ভূতের আছর, জাদু-টোনা-তাবিজ-আলগা বাতাসের প্রভাব বলেই বিশ্বাস করেন অনেকে। ‘চিকিৎসা’ও করা হয় তেলপড়া, পানিপড়া, তাবিজ, ঝাড়-ফুঁক, ‘শিকল থেরাপি’ ইত্যাদির মাধ্যমে। বিষন্নতাসহ কিছু উপসর্গ আবার অনেকের চোখে বয়সের দোষ, বিয়ের জন্য টালবাহানা, ঢং বা ভং ধরা।

কারও কাছে আবার মানসিক রোগের লক্ষণ ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। আত্মহত্যা-প্রবণ ব্যক্তিকে আত্মীয়-বান্ধব বা অভিভাবকরা সঠিক সহযোগিতা না করে কটু-তির্যক কথা শোনান, অনেককে শাস্তিও দেয়া হয়। ফলে আত্মহত্যা-প্রবণ ব্যক্তি নিজের মনের কথা কারও সঙ্গে খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে পারেন না, ফলে তার হতাশা বাড়তে থাকে। কিছু বিষয় আছে, যা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে আত্মহত্যার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। সে রকম কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- একাকীত্ব (অবিবাহিত বা বিবাহ-বিচ্ছেদ)। সম্প্রতি আপন বা প্রিয় কারও মৃত্যু বা বিচ্ছেদের শোক, বেকারত্ব বা চাকরিচ্যুতি, অস্থির বা দূষিত সামাজিক পরিবেশ, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, পরিবারের কারও মানসিক রোগ, দুরারোগ্য বা আরোগ্য সম্ভব নয় এমন শারীরিক রোগ, আত্মহত্যার মাধ্যমগুলোর (যেমন- কীটনাশক, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি) সহজপ্রাপ্যতা ইত্যাদি।

অন্যদিকে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা, এগুলোকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতিও আত্মহত্যা-প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক-মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা-প্রবণতা কমায়।

 

ডা. মুনতাসীর মারুফ

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ

সহযোগী অধ্যাপক,স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অ্যাম্বুলেন্স হার্বাল ও আয়ুর্বেদিক হোমিওপ্যাথি রুপ চর্চা