অনিয়ন্ত্রিত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

    অনিয়ন্ত্রিত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রাণিকে সুপার-বাগের হুমকির সম্মুখীন হতে হবে। ইদানীং এন্টিবায়োটিক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেই এই ব্যাকটেরিয়ার (সুপার-বাগ) সংক্রমণ ঠেকাতে অধিকাংশ ওষুধই ব্যর্থ হচ্ছে। জানা গিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল এবং রাশিয়ার ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সংক্রমণের ৬০ শতাংশই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। আগামীতে বাংলাদেশসহ বিশে^র অনেক দেশকে এই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার চ্যালেঞ্জ চরমভাবে মোকাবেলা করতে হবে। আজ ১৭ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার, সকাল ১১.০০টায় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) আয়োজিত “এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপার-বাগ : ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য”-শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

    ঢাবির ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর এ বি এম ফারুক-এর সভাপতিত্বে উক্ত গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনার  সূত্রপাত করেন ডা. ফারিজা ফাইরোজ। বক্তব্য রাখেন পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, পবা’র যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শক ডা. মু. মুশতাক হোসেন, বি সি এস আই আর –এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এম ফরমুজুল হক, পবা’র সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ, বানিপা’র সভাপতি প্রকৌ. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পবা’র সদস্য মুস্তারি বেগম, এলিজা রহমান প্রমুখ।

    বক্তারা বলেন, এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বর্তমানে একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এন্টিবায়োটিক হচ্ছে এমন একটি ঔষধ যা দ্বারা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনজনিত রোগের চিকিৎসা করা হয়। এই সকল ঔষধের প্রতি যখন ব্যাকটেরিয়া আর সংবেদনশীল থাকে না তখনই এন্টিবায়োটিক ওই ব্যাকটেরিয়াটির বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনজনিত রোগের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে খুবই সাধারন ইনফেকশন/সংক্রমন-এর চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়ে। সারাবিশ্বে এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা এখন একটি বৃহৎ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের প্রতি একটি ক্রমবর্ধমান গুরুতর হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে যে, কেবলমাত্র ইউরোপেই প্রতি বছর ৩৩,০০০ মানুষ এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারনে মৃত্যুবরণ করে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এই অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, যদি এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে রোধ না করা যায়। যদি এভাবেই এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে অতি সাধারন রোগেও মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।

    এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কিছু কারন হিসেবে বক্তারা বলেন, অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক সেবন করা, রেজিস্টার্ড স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ ব্যাতিরেকে ভূল এন্টিবায়োটিক সেবন করা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ অনুযায়ী কোর্স সম্পন্ন না করা, এন্টিবায়োটিক-মিশ্রিত পশুখাদ্য এবং পোলট্রি-ফীড গ্রহনকারী প্রাণির মাংস খাওয়া,পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে এন্টিবায়োটিক ঔষধ শেয়ার / ভাগাভাগি করে নেয়া, প্রেসক্রিপশন ব্যতিরেকে এন্টিবায়োটিক ঔষধ জনসাধারনের নিকট বিক্রয় করা।

    আর্ক ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে ডা. ফারিজা ফাইরোজ বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা এন্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য সাধারন ঔষধের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারেন না, যে কারনে তারা অনেকসময় নিজের অজান্তে/অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকেন। গবেষনায় এই তথ্যটিও উঠে এসেছে যে, মুদি দোকানে পর্যন্ত ঔষধ বিক্রয় করা হয়ে থাকে। এছাড়াও কমিউনিটি ক্লিনিকে ঔষধ সরবরাহের অপর্যাপ্ততার কারনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পক্ষে রোগীকে পর্যাপ্ত এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রদান করা সম্ভব হয় না, যে কারনে অনেকসময় রোগী ফুলকোর্স সম্পন্ন করেন না (যেহেতু এই ঔষধ ব্যায়বহুল)। তথ্যমতে, বাংলাদেশের এন্টিবায়োটিক ঔষধসমূহের অর্ধেকেরও বেশি নিয়মবহির্ভূত ভাবে ব্যবস্থাপত্রে প্রদান, বিতরন কিংবা বিক্রয় করা হয়ে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শপত্রের সংক্ষিপ্ততা, রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান না করা, সঠিক রোগ নির্নয়কে গুরুত্ব আরোপ না করা, এবং চিকিৎসকদের দ্বারা সঠিক এন্টিবায়োটিক প্রদান না করার ফলে দেশে এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা রোগীর অনুপাতে অপ্রতুল (১:২৫০০)। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলের রোগীরা, যারা চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে শহরে আসেন, তারা সাধারণতঃ রোগ নির্নয়ের সঠিক ল্যাবরেটরি-রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান না এবং ফলোআপ ভিজিটের জন্য পুনরায় শহরে আসতে চান না বা অপারগ হন; এবং তারা সাধারনত তাৎক্ষণিকভাবে সুস্থ হবার জন্য চিকিৎসা করিয়ে থাকেন। এছাড়াও এন্টিবায়োটিক ঔষধের মূল্য বেশি হবার কারনে অনেক রোগীর পক্ষে ফুলকোর্স সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমান ঔষধ ক্রয় করা সম্ভব হয় না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা তাদের রোগের লক্ষণ কমে আসলে ঔষধ গ্রহণ করা বন্ধ করে দেন; যদিও তখনও তাদের শরীরে রোগজীবাণু সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয় না।

    উক্ত গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, অধিকাংশ গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগীর খাদ্যে পশু-চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অপরিমিত কিংবা অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক মিশ্রিত করা হয়ে থাকে, যা পরবর্তীতে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা সৃষ্টি করে। পশুখাদ্য এবং পোলট্রি-ফীডে এন্টিবায়োটিক মিশ্রিত করার ফলে পরবর্তীতে সেটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেও এই সমস্যার সৃষ্টি করছে; যদিও পশুখাদ্য-আইন ২০১০ এবং ২০১৩ অনুযায়ী শারীরিক বৃদ্ধি/মোটাতাজাকরণের জন্য পশুখাদ্যে ও পোলট্রিফীডে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পূণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র রোগের চিকিৎসার জন্য খাদ্যে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

    এম এ ওয়াহেদ

    সম্পাদক

    পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন