বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ২০১৮

    আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ২০১৮-১৯ সালের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের জন্য থিম নির্ধারণ করেছে ‘পরিবার এবং ডায়াবেটিস’। চলতি বছরের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের ক্যাম্পেইনে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা, যতœ, প্রতিরোধ এবং এ সংক্রান্ত শিক্ষা বিষয়ে পরিবারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিদিন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ইনসুলিন কেনা ও রোগ মনিটর করা একটি পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল বিষয়। তাই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জ্ঞানার্জন জরুরি বিষয় বলে বিবেচিত হচ্ছে।

    স্মরণ করা যেতে পারে, ডায়াবেটিস বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ^ ডায়াবেটিস দিবস (১৪ নভেম্বর) বহাল থাকতেও বিশ^ স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে দুবছর আগে বেছে নেয়া হয়েছিল ডায়াবেটিসকেই। এ থেকে সহজেই বুঝে ওঠা যায় যে বিশ^ব্যাপী ডায়াবেটিস রোগকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বিশ^ স্বাস্থ্য দিবসের ফোকাস হিসেবে ডায়াবেটিসকে বেছে নেয়ার পেছনে কাজ করেছিল তিনটি বিষয়। এক. নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ডায়াবেটিস রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং মানবজীবনে রোগটির বড় বোঝা হয়ে ওঠা ও তার পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। দুই, ডায়াবেটিসকে মোকাবেলার জন্য সুনির্দিষ্ট, কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায় নির্ধারণ করা। যা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, রোগনির্ণয়, চিকিৎসা ও যতেœ কাজে আসবে। তিন, ডায়াবেটিসের ওপরে প্রথম গ্লোবাল রিপোর্ট উপস্থাপন যা মানবজীবনে রোগটির বড় বোঝা হয়ে ওঠা ও তার পরিণতি সম্পর্কে জানাবে। স্বাস্থ্যরীতি উন্নয়নে নজরদারি নিশ্চিত করবে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে এবং ডায়াবেটিসের কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলবে।

    আইডিএফ-এর সর্বশেষ সমীক্ষা থেকে জানা যায়, বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ৪২৫ মিলিয়ন, অর্থাৎ ৪২ কোটিরও বেশি। তবে শঙ্কার বিষয় হলো প্রতি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন এখনও জানতে পারছেন না যে তার ডায়াবেটিস রয়েছে। রোগ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। অশনাক্ত থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হল বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ক্যাম্পেইন, যা প্রতিবছর ১৪ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল-এ ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন। ২০০৭ সালে সিদ্ধান্ত হয়, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ অভিযান পরিচালনার থিমটি আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ২০০৭-০৮ এর থিম নির্ধারিত ছিল ‘শিশু ও তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস’। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের থিম নির্ধারিত হয়েছিল,ডায়াবেটিস শিক্ষা ও প্রতিরোধ। ২০০৭-০৮ সালে এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলো আরও বেশি শিশু ও তরুণকে এই পরিচর্যার আওতায় আনা। ডায়াবেটিসের জরুরি সংকেত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। আর শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা।

    বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে প্রায় ৯০ লাখ, বছরে বাড়ছে আরও ১ লাখ রোগী। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করলে রোগী নিজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সব বয়সের মানুষই আজ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছরই দ্বিগুণহারে বাড়ছে নতুন নতুন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা। সচেতনতার অভাবে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম স্থানে।

    ডায়াবেটিস থেকে নিজেকে বাঁচাতে কিছু বিষয় জরুরি - 

    * ভালোমতো প্রাতরাশ বা ব্রেকফাস্ট করুন নিয়মিত।

    স্বাস্থ্যসম্মত আহারে থাকবে প্রচুর পত্রবহুল শাকসবজি, তাজা ফল, মোটা শস্যদানা এবং বাদাম। এতে কমবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং পরিহার করা যাবে ডায়াবেটিসের জটিলতা।

    ** বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসের বোঝা লঘু করতে হলে প্রয়োজন মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত প্রাতরাশের আওতায় আনা। স্বাস্থ্যসম্মত প্রাতরাশ অনেক কমিয়ে আনে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে হাইক্যালরি ও অপুষ্টিকর সস্তা খাবার (ফাস্টফুড) গ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। যেসব খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়: যেমন শাকসবজি, তাজা ফল, মোটা শস্যদানা এবং অসম্পৃক্ত চর্বিÑ এগুলো সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য হওয়া উচিত।

    বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুস্থ জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সুস্থ জীবনযাপন মানে হচ্ছেÑ স্বাস্থ্যকর খ্যাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা বা ব্যয়াম এবং মন সুস্থ রাখা। মন সুস্থ রাখতে হলে মনের ওপর চাপ নেয়া যাবে না।

    ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য হলিস্টিক পদ্ধতি এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।  হলিস্টিক পদ্ধতি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিৎসার মূল চাবিকাঠি দুটি। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম। রোগীর বয়স এবং রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। পুষ্টিকর ও পরিমিত আহার তাকে ফিট রাখে। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত প্রায় এক দশক যাবত পান্থপথে হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার ও ধানমন্ডীতে হলিস্টিক হেলথ ক্লাব-সহ হলিস্টিক চিকিৎসায় দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে হাজার হাজার ডায়াবেটিস রোগীর জীবনে সুবাতাস বয়ে এনেছে। এর ফলে একদিকে যেমন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে আসছে। অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস রোগীদের জীবনে স্বস্তি নেমে এসেছে। বহু রোগী ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে চমৎকার জীবন যাপন করছেন। বাংলাদেশের ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য হলিস্টিক চিকিৎসা উপকারী বন্ধুর মতো কাজ করছে। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডায়াবেটিস পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল সংক্রান্ত সফল কর্মশালা নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়ে চলেছে।  এ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বহু রোগী ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণরূপে ইনসুলিন ত্যাগের মাধ্যমে ডায়াবেটিস মোকাবেলার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। 

     

    অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

    হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার

    গ্রীণরোড়, ঢাকা।