প্রসব পরবর্তী মায়ের মানসিক সমস্যা : পোস্ট পারটাম ব্লু

    প্রথম সন্তান প্রসব নিয়ে কতই না শিহরিত ছিল রুনা! কত আনন্দ! কত পরিকল্পনা! কত স্বপ্নের জাল বোনা! আর সন্তান জন্মের পর? বাড়ি জুড়ে আত্মীয়-পরিজনের উৎসবের মাঝেই কেমন যেন বিষাদ-মাখা রুনার ভুবন। কেন এই বিষাদ? কেন এই মন খারাপ-করা অস্বস্তিকর অনুভূতি?- নিজের ভেতর কোন উত্তর পায় না সে। মনের আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোণা সারাটা সময়। সবার আড়ালে সে মেঘ কখনো সখনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে রুনার দৃষ্টি-পথে। কখনো অকারণ বিরক্তি, আবার কিছুটা সময় কেটে যায় স্বাভাবিক। মুখ ফুটে কাউকে বলা হয় না অন্তর্গত অস্বস্তির কথা।  কি মনে করবে সবাই? এই ভাবনা কন্ঠ চেপে ধরে তার।

    প্রসবের চার থেকে ছয় সপ্তাহের ভেতর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রসূতি আবেগজনিত সমস্যায় ভোগেন। নতুন মা অস্থিরতা বোধ করেন, উদ্বেগ ও খিটখিটে বিরক্তি অনুভব করেন, অকারণেই মন খারাপ হয়ে যায়- কান্না পায়, সবকিছু কেমন যেন বিশৃংখল-এলোমেলো মনে হয়, আবার হঠাৎ করেই খানিকটা সময়ের জন্য উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। প্রসবের তিন থেকে পাঁচ দিনের ভেতরেই সাধারণত এসব লক্ষণ দেখা যায়। কয়েক দিন থেকে সপ্তাহ পর্যন্ত এই লক্ষণগুলো স্থায়ী হতে পারে। প্রসব-পরবর্তী সাময়িক এই মানসিক অবস্থাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়- ‘বেবী ব্লু’,‘ম্যাটারনিটি ব্লু’ বা ‘পোস্ট-পারটাম ব্লু’। প্রসব ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে নারীদেহে হরমোনের তারতম্য, প্রসবজনিত মানসিক চাপ, মাতৃত্বের দায়িত্ববোধের উপলব্ধি - সব মিলিয়েই নারীর মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সাধারণত প্রথম গর্ভধারণের ক্ষেত্রে এ সমস্যাটি বেশী দেখা যায়। ‘ম্যাটারনিটি ব্লু’-তে আক্রান্ত নতুন মায়ের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সমর্থন, সহমর্মিতা আর শিক্ষা। শিক্ষা - সন্তান প্রতিপালনের, শিক্ষা - দায়িত্বশীলতার, শিক্ষা - দৃঢ়তার সাথে মানসিক চাপ মোকাবেলার। পরিবারের, বিশেষ করে স্বামীর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এ সময় স্ত্রীর পাশে থাকার, তাকে সাহস যোগানোর। নতুন মায়েরও উচিত মনের এই দুঃখবোধ চাপা না রেখে স্বামী বা প্রিয় কারো সাথে তা শেয়ার করা, সহযোগিতা কামনা করা। কিছুদিন পর আপনা-আপনি এ সমস্যা কেটে যায় বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওষুধ দিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।

    ডা. মুনতাসীর মারুফ
    মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ
    সহকারী অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর